বিএনপি ও মধ্যপ্রাচ্যের আগুন : কাকতালীয় না ভূ-রাজনৈতিক খেলা?
বিশেষ বিশ্লেষক | ঢাকা
বিখ্যাত মার্কিন লেখক স্টিভেন কিং একবার বলেছিলেন, “কাকতালীয় হলো সেই সব সুতো, যা দিয়ে ভাগ্য তার অদৃশ্য জাল বুনে চলে।” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই 'অদৃশ্য জালের' এক অদ্ভুত ও অমীমাংসিত সমীকরণ বারবার ফিরে আসে। ২০২৬ সালে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক তীব্র গণ-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে বিএনপি যখন দীর্ঘ দেড় দশক পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলো, ঠিক তখনই বিশ্ব মানচিত্রের আরেক প্রান্তে জ্বলে উঠল যুদ্ধের দাবানল। অনেকেই একে নিছক ‘কাকতালীয়’ হিসেবে দেখলেও তথ্যের গভীরে তাকালে ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বেজে উঠেছিল ইরাক যুদ্ধের দামামা। ঠিক দুই যুগ পর ২০২৬ সালে দলটির নতুন করে ক্ষমতায় ফেরার সন্ধিক্ষণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ইরান ও পশ্চিমা যৌথ বাহিনীর সংঘাতের লেলিহান শিখা। প্রশ্ন উঠেছে— বিএনপি ক্ষমতায় এলেই কেন মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলে? এটি কি কেবলই ভাগ্যের পরিহাস, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূ-খণ্ডে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক দাবার কোটের কোনো অদৃশ্য চাল?
পুরানো চেনা সংকট : ২০০১-০৬ এবং জোট সরকারের অগ্নিপরীক্ষা
২০০১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকারকে এক ‘কাঁট বিছানো পথে’ হাঁটতে হয়েছিল। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি এক ধাক্কায় ৩০-৪০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। সেই সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এটি ছিল এক বিশাল আঘাত। তেলের বাড়তি দামের ফলে পরিবহন ও কৃষি সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ শতাংশের উপরে উঠে গিয়েছিল। তীব্র বিদ্যুৎ সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়া সরকারকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছিল। একইসাথে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান এবং আন্তর্জাতিক মহলে ‘মৌলবাদী রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে বিপুল শক্তি ব্যয় করতে হয়েছিল। সেই সময়কার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল অর্থনীতিতেই নয়, বরং সরকারের কূটনৈতিক ম্যান্ডেট বাস্তবায়নেও বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইএমএফ-এর কঠিন শর্ত ও রিজার্ভের মরণফাঁদ
২০০১-এর তুলনায় ২০২৬-এর বাস্তবতা আরও জটিল ও সংকটাপন্ন। বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফ-এর ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের কঠিন শর্তের জালে আবদ্ধ। আইএমএফ-এর দেওয়া শর্ত অনুযায়ী নিট রিজার্ভ একটি নির্দিষ্ট সীমায় ধরে রাখা এবং ভর্তুকি কমানোর যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ইরান-যৌথ বাহিনী সংঘাতের ফলে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০-১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে সরকারকে বাধ্য হয়ে তেল-গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে, যা সরাসরি জনরোষ তৈরি করবে। বর্তমানে রিজার্ভ ১২-১৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যা আমদানির এলসি (LC) খোলা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধকে এক দুঃস্বপ্নে পরিণত করতে পারে। ২০০১ সালে দাতা সংস্থাগুলোর চাপ থাকলেও ২০২৬-এর মতো এমন 'ঋণের ফাঁদ' এবং 'রিজার্ভ সংকট' আগে কখনো দেখা যায়নি, যা নবগঠিত সরকারের হাত-পা বেঁধে ফেলেছে।
দিল্লি ফ্যাক্টর : ভূ-রাজনৈতিক খেলার নতুন মোড়
এই সমীকরণে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান। গত দেড় দশকে দিল্লির সাথে বাংলাদেশের যে কৌশলগত সমীকরণ ছিল, ২০২৬-এর পটপরিবর্তনে তাতে বড়ো ধরনের ছেদ পড়েছে। ভারত এখন একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, অন্যদিকে বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রের প্রস্থানে কিছুটা ‘কূটনৈতিক আড়ষ্টতা’ অনুভব করছে। যদি ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হয় এবং বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে, তবে দিল্লি এই সুযোগে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে। ভারতের সাথে ঝুলে থাকা তিস্তা বা সীমান্ত ইস্যুগুলো যখন অমীমাংসিত, তখন এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নবগঠিত সরকারকে দিল্লির সাথে এক অসম কূটনৈতিক দরকষাকষিতে ঠেলে দিতে পারে। ভূ-রাজনৈতিক এই 'খেলায়' দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক ২০২৬ সালের স্থিতিশীলতার অন্যতম চাবিকাঠি।
জুলাই অভ্যুত্থান ও গণ-আকাঙ্ক্ষার অগ্নিপরীক্ষা
২০২৬ সালে বিএনপির এই ক্ষমতার পুনরুত্থান কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক আকাশচুম্বী প্রত্যাশার ফসল। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর গঠিত এই সরকারের ওপর মানুষের চাওয়া— দ্রব্যমূল্যের তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল সংস্কার। কিন্তু এমন এক ভঙ্গুর অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়া মানেই হলো মুদ্রাস্ফীতির লাগাম আরও ছিঁড়ে যাওয়া। নবগঠিত সরকারের জন্য এটি এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা— একদিকে অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ আর অন্যদিকে বিশ্ববাজারের অগ্নিমূল্য। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে গণ-আকাঙ্ক্ষা জনরোষে রূপ নিতে সময় নেবে না। জনগণের এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর পদধ্বনি
অনেক ভূ-রাজনৈতিক বোদ্ধাই এখন আশঙ্কা করছেন যে, ইরান সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে এর প্রভাবে অনেক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা বলে, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতি অনেক দেশে ‘রেজিম চেঞ্জ’ (Regime Change) বা অনিচ্ছাকৃত ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে। নবগঠিত বিএনপি সরকারের জন্য এটিই সবচেয়ে বড়ো ভূ-রাজনৈতিক হুমকি। যদি যুদ্ধের প্রভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামে এবং রিজার্ভ শূন্যের কোটায় পৌঁছায়, তবে সেই অর্থনৈতিক হাহাকারকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ অপশক্তিগুলো সরকার পরিবর্তনের নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে পারে। জামায়াত বা এনসিপি-র মতো দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাজপথের উত্তাপ এই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। এখানে 'কাকতালীয়' কোনো বিষয় নেই, বরং আছে সুনিপুণ ভূ-রাজনৈতিক প্রকৌশল।
উপসংহার
বিএনপি ক্ষমতায় আসা আর মধ্যপ্রাচ্যে আগুন লাগা— এটি কেবল কাকতালীয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ২০০৩ সালে জোট সরকার কোনোমতে সেই ঝাপটা সামলে উঠলেও ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট অনেক বেশি ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল। বর্তমানের সংকুচিত রিজার্ভ এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা সামলানো হবে এক বিশাল হিমালয় পাড়ি দেওয়ার মতো। নবগঠিত সরকারের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে— দিল্লির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এবং কূটনৈতিক কৌশলে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে রক্ষা করা। আগামীর দিনগুলো বলে দেবে, বাংলাদেশ কি এই আন্তর্জাতিক বিষাক্ত খেলা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে আরও ভয়াবহ আকারে।
এই বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধটি বাংলাদেশের বিএনপির ক্ষমতায় আসা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক সংযোগ তুলে ধরেছে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ইরাক যুদ্ধ এবং ২০২৬ সালে দলটির পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের সময় ইরান-পশ্চিমা সংঘাত শুরু হওয়ার ঘটনাকে লেখক নিছক কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ। ২০০১-০৬ সালে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিএনপি সরকার গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ বাংলাদেশ এখন আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের কঠিন শর্তের অধীনে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে ১০০-১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা রিজার্ভ সংকট আরও গভীর করবে এবং আইএমএফের শর্ত পূরণ করা কঠিন করে তুলবে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই সরকারের উপর জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ, কিন্তু বৈশ্বিক সংকটের কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে, কারণ দিল্লি তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রের প্রস্থানে কূটনৈতিক আড়ষ্টতা অনুভব করছে। লেখক উপসংহারে বলেছেন যে এটি নিছক কাকতালীয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক দাবার একটি জটিল খেলা, যেখানে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে।